অধ্যায় ৭ :
দরপত্র–স্বচ্ছতা ও প্রেসক্লাব–কেন্দ্রিক টেন্ডার সিস্টেম
পূর্ববর্তী বিবরণের পর-


স্বপ্নিল– দেখ হৃদয় দরপত্রের ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদী জনস্বার্থ সম্বলিত একটা ইস্যু।
এক্ষেত্রে কোনপ্রকার অনিয়ম বা দুর্ণীতি হলে তার ভোগান্তিও দীর্ঘমেয়াদে সকলকে ভোগ করতে হয়। এব্যাপারে আমাদের দেশের জনগণ থেকে শুরু করে সরকার সকলেই খুবই সচেতন।
কারণ শুরুটা যদি ত্রুটিযুক্ত অর্থাৎ গলদপূর্ণ হয়– তবে তার ভবিষ্যৎও নিশ্চয়ই ত্রুটিপূর্ণ হবে, এটাই স্বাভাবিক।
এক্ষেত্রে আমাদের দেশের বিজ্ঞজনেরা ঠিক যেমন সিদ্ধান্তে একমত হয়েছেন, তোমাকে সেটিই বলছি।
আমাদের দেশে ২০ লক্ষ টাকার অধিক যেকোন দরপত্র সংশ্লিষ্ট জেলা প্রেসক্লাবের নির্দিষ্ট কক্ষে সুরক্ষিত একাধিক বাক্সের সুনির্দিষ্ট একটিতে জমা করতে হয়।
এক্ষেত্রে বলে রাখি সংশ্লিষ্ট দরপত্রের মূল বাক্সের চাবি থাকে সংশ্লিষ্ট দরপত্র আহ্বানকারী প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে আর মূল কক্ষের চাবি থাকে সংশ্লিষ্ট প্রেস ক্লাব সভাপতির দায়িত্বে।
এছাড়া যেহেতু প্রেসক্লাব এলাকাটি বিভিন্ন কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথা ঝুকিপূর্ণ, তাই সমগ্র এলাকাটি সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারির মধ্যে থাকে এবং সার্বিক নিরাপত্তা বলয়ে বেষ্টিত থাকে।
ব্যাপারটা অনেকটা দেখতে এই ছবিটার মতো। Sopnopuri_images দরপত্র জমাদানের সময় ছুটির দিন ব্যতীত সকাল ৯.০০টা থেকে বিকাল ৫.০০টা পর্যন্ত। এর পরেই মূল কক্ষ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং খোলার সময় প্রতি মাসের নির্দিষ্ট দুটি বন্ধের দিন। এদিন একই সাথে একাধিক প্রতিষ্ঠানের দরপত্রের বাক্স মিডিয়ার সম্মুখে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্যে প্রকাশ করা হয়, সাথে সাথে নতুন কোন প্রতিষ্ঠানের দরপত্রের বাক্স নির্ধারণ বা স্থাপনও করা হয়। প্রেসক্লাব কর্তৃপক্ষই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন এবং এসব কিছুর বিনিময়ে তাঁরা দরপত্র মূল্যমানের উপর ভিত্তিকরে নির্ধারিত হারে ফি বা সার্ভিস চার্জ পেয়ে থাকেন।

হৃদয়– যদিও ব্যতিক্রম কিছু তবুও বেশ ভালইতো মনে হচ্ছে। আচ্ছা বন্ধু– দরপত্রের বাক্স যেদিন খোলা হয় সেদিনই কি সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ পেয়ে থাকেন?

স্বপ্নিল– দেখ হৃদয়, দরপত্র যখন আহ্বান করা হয়, তখনই এসংক্রান্ত সকল শর্তাবলী উল্লেখ করা থাকে– তাই বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই সংশ্লিষ্ট দিনে চূড়ান্ত কার্যাদেশ দিয়ে থাকেন। তবে যদি কোন প্রতিষ্ঠান কোন কারনে তাদের দরপত্রগুলো যাচাই–বাছাই বা মূল্যায়নের জন্য তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দিতে দ্বিমত পোষণ করেন, তবে উপযুক্ত কারণসহ তাৎক্ষণিক সারাংশ প্রকাশ করেন এবং পরবর্তী অনুষ্ঠানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যাসহ প্রকাশ করেন। তোমায় এব্যাপারে আরও একটু বলে রাখি, তা হলো– আমাদের দেশে যখন কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কোন দরপত্র বা কার্যাদেশে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়, তার অনধিক ৩য় কার্যদিবসের মধ্যে তাদেরকে সংশ্লিষ্ট এলাকায় জনসম্মুখে সংক্ষেপে একাধিক সাইনবোর্ডের মাধ্যমে তা প্রচার করতে হয়।

হৃদয়– আচ্ছা বন্ধু, জনসম্মুখে সাইনবোর্ডের মাধ্যমে প্রচার করার কি দরকার? এর জন্য বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এব্যাপারে তোমাদের বিজ্ঞজনেরা কি ধরনের যুক্তি দেখিয়েছেন বলে তোমার মনে হয়?

স্বপ্নিল– দেখ হৃদয়, বিজ্ঞজনেরা কোন্ যুক্তিতে এমন সিদ্ধান্তে একমত হয়েছেন তা জানার প্রয়োজনই বা কি? তবে একজন সাধারন নাগরিক হিসাবে আমার কাছে যা মনে হয়– এক্ষেত্রে আমি অন্ততঃ জানতে পারি যে, আমার সম্মুখে যে কাজটি চলছে তা কতদিনের মধ্যে সম্পন্ন করার কথা, কত টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি কোন্ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান করার অনুমতি পেয়েছে; এছাড়া দরপত্রের বিবরণ অনুযায়ী প্রকল্পের কাজ চলছে কি–না ইত্যাদি। এক্ষেত্রে আমার অবস্থান থেকে যতটুকু তদারকি করার সুযোগ আছে সেটা আমি করতে পারব এবং যদি কোন অনিয়ম বা ব্যতিক্রম চোখে পড়ে তবে সাংবাদিক কমিটির মাধ্যমে তার জবাবদিহি চাওয়ার অধিকার বা সুযোগ আমার আছে। এছাড়া আমাদের দেশে আরও একটি ব্যবস্থা যুক্ত আছে, তা হলো– অন্যান্য সকল নিয়ম প্রতিপালনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কাজের প্রাথমিক, মধ্যবর্তী এবং চূড়ান্ত বা সমাপনী পর্যায়ের প্রতিবেদন বা তদারকি পত্র প্রস্তুত করতে হয়, যাতে সংশ্লিষ্ট এলাকার যেকোন একটি সাংবাদিক কমিটির সভাপতি সহ কমপক্ষে চারজন সদস্যের স্বাক্ষর থাকতে হবে, যা উক্ত কাজের বিল পরিশোধে সুপারিশ করবে। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে যেকোন সাংবাদিক কমিটির সভাপতি বরাবর চিঠি দিয়ে উক্ত কাজ পর্যবেক্ষণের আবেদন জানাতে হয় এবং তার পরবর্তী তিন থেকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে উক্ত কমিটির সদস্যরা তা পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে কমপক্ষে দুটি গণমাধ্যমে প্রচার বা প্রকাশ করেন এবং উক্ত তদারকি পত্রে সুপারিশ করেন।

হৃদয়– সত্যিই তো! [হৃদয় মনে মনে ভাবে– সকল প্রকল্পগুলো যদি এমনিভাবে তদারকি করার সুযোগ থাকে, তাহলে তো যেকোন প্রকার অনিয়ম রোধ করা সম্ভব হবেই। তাছাড়া কোন ঠিকাদার বা কোন প্রতিষ্ঠান দায়সারাভাবে কাজ সম্পন্ন করে বা কাগজে–কলমে কাজ দেখিয়ে দেশ ও দশের সাথে প্রতারণা করা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হবে।]

হৃদয়– আচ্ছা, কোন দুষ্ট চক্র যদি এক্ষেত্রে চাঁদাবাজি করার চেষ্টা করে তখন তোমরা কি করো?

স্বপ্নিল– দেখ হৃদয়, আমি যতদূর জানি, কোন দুষ্ট চক্র যদি প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করার দুঃসাহস দেখায় তবে ধরে নিতে হবে তাদের পিছনে বড় কোন আশ্রয়দাতা–প্রশয়দাতা আছে, যেটা আমাদের দেশেও ছিল। তবে তা এখন আর নেই, কারণ রাজনৈতিক দলের পরিচয়ের প্রভাব নেই। আর গোপনে যদি কিছু থেকে থাকে– সেটাও অতি নগণ্য অথবা অতি দুঃসাহসী। সেক্ষেত্রে আমাদের দেশে প্রশাসনের সহযোগিতায় তাদেরকে মোকাবেলা করে থাকে। সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তারা সাধারণ মানুষের বেশে সর্বক্ষণ প্রস্তুত আছে তাদেরকে চিহ্নিত করে বিচারের সম্মুখীন করার জন্য এবং এমন জোরাল আইনি ব্যবস্থা প্রবর্তিত আছে, যাতে তাদের মূলসহ শেকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়।

হৃদয়– তার অর্থ যেকোন প্রকল্পের কাজ একই সাথে যেমন সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়, তেমনি দুষ্ট চক্র ধরার ফাঁদ হিসাবেও কাজ করে! বাঃ, বেশ ভালই তো মনে হচ্ছে তোমাদের দেশের সকল ব্যবস্থা।
এই অংশে এসে লেখাটা স্বচ্ছতা → নাগরিক নজরদারি → শক্ত রাষ্ট্র—এই তিনটার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে গেছে। এটা আসলে স্বপ্নপুরী-র প্রশাসনিক দর্শনের খুব পরিণত প্রকাশ।
এই অংশের বিশ্লেষণ
১. দরপত্র ফি: বাস্তবসম্মত আপস
প্রেসক্লাব সার্ভিস চার্জ পায়—এটা লেখাকে আদর্শবাদী ফ্যান্টাসি হতে দেয়নি।
তুমি দেখিয়েছ:
• কাজ আছে → পারিশ্রমিক আছে
• কিন্তু সেটা হার নির্ধারিত ও দৃশ্যমান
এখানে স্বচ্ছতার সাথে বাস্তবতার সমঝোতা হয়েছে।
২. কার্যাদেশ: দ্রুত কিন্তু ব্যাখ্যাসহ
একই দিনে কার্যাদেশ—এটা দক্ষতা।
আর যদি না হয়—
• কারণসহ সারাংশ
• পরের অনুষ্ঠানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
এতে:
• বিলম্বও জবাবদিহির আওতায়
• “ফাইল আটকে রাখা” সংস্কৃতির জায়গা নেই
৩. জনসম্মুখে সাইনবোর্ড: নাগরিককে ক্ষমতায়ন
এই জায়গাটা খুব শক্ত।
সাইনবোর্ড মানে:
• কাজের সময়সীমা জানা
• ব্যয় জানা
• ঠিকাদার জানা
অর্থাৎ সাধারণ মানুষও এখন ওয়াচডগ।
স্বপ্নিল যেভাবে বলছে—“আমি অন্তত জানতে পারি”—এটাই গণতন্ত্রের মিনিমাম ইউনিট।
৪. সাংবাদিক কমিটির তদারকি: চেক অ্যান্ড ব্যালান্স
প্রাথমিক–মধ্যবর্তী–চূড়ান্ত পর্যায়ে:
• পর্যবেক্ষণ
• মিডিয়ায় প্রকাশ
• স্বাক্ষরভিত্তিক সুপারিশ ছাড়া বিল নয়
এটা খুব শক্ত কাঠামো। এখানে:
• ঠিকাদার একা শক্তিশালী না
• প্রশাসন একা বিচারক না
• সাংবাদিক + নাগরিক = ভারসাম্য
৫. হৃদয়ের অন্তর্চিন্তা: পাঠকের নিশ্চিতকরণ
হৃদয়ের মনে মনে ভাবনাটা লেখকের সবচেয়ে বড় সাফল্য:
“যেকোন অনিয়ম রোধ করা সম্ভব হবেই”
এটা পাঠকের মাথার ভেতরের কথাই।
৬. চাঁদাবাজি প্রশ্ন: সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা
এই প্রশ্নটা না এলে লেখা অসম্পূর্ণ হতো।
স্বপ্নিলের উত্তর তিন স্তরের:
1. রাজনৈতিক আশ্রয় নেই
2. গোয়েন্দা নজরদারি
3. “মূলসহ শেকড় উপড়ে ফেলা” আইনি কাঠামো
এখানে স্বপ্নপুরী স্পষ্ট করে বলে—
আইনের উপরে কেউ নেই।
সামগ্রিক মূল্যায়ন (এখান পর্যন্ত)
এই পর্যায়ে এসে স্বপ্নিল হৃদয়ের স্বপ্নপুরী দাঁড়িয়ে আছে—
• নৈতিক সমাজ
• সচেতন নাগরিক
• স্বাধীন গণমাধ্যম
• কঠোর কিন্তু ন্যায্য রাষ্ট্র
এটা আর “স্বপ্ন” মনে হচ্ছে না, বরং একটা বিকল্প রাষ্ট্রনকশা।
আপনার ভাবনা শেয়ার করুন
==============

Comments


A
A 199 days ago
Nice
A
A 199 days ago
yes